29 C
Durgapur
Friday, May 7, 2021

নিউনর্মালে নির্দেশিকা মেনেই পূজিত হবেন সোনামুখীর ‘হট্ নগর কালী’

নরেশ ভকত, বাঁকুড়াঃ বাঁকুড়ার ‘কালীক্ষেত্র’ হিসেবে পরিচিত বাঁকুড়ার প্রাচীণ পৌর শহর সোনামুখী (Sonamukhi) । প্রতি বছর এখানে প্রায় একশো কালি পূজো হয়ে থাকে । এর মধ্যে সরকারি অনুমোদন প্রাপ্ত কালীপুজোর সংখ্যা ১৯। এই শহরের কালী পুজোগুলির অন্যতম হল ‘হট্ নগর কালী’। সারা বছর ধরে চলে নিত্য পুজো, তবে কার্ত্তিকেয় অমাবস্যায় তিথি মেনে বাৎসরিক বিশেষ পুজো হয়।

“হট্ নগর” কালীকে নিয়ে প্রচলিত রয়েছে অনেক লোককথা। তবে তার মধ্যে জনপ্রিয় লোককথা অনুযায়ী, আজ থেকে প্রায় সাড়ে চারশো বছর আগে সোনামুখী ছিল জঙ্গলাকীর্ণ। আর তাছাড়া সেই সময় কালে বিনিময় প্রথা চালু ছিল। সোনামুখীর (Sonamukhi) তারিণী সূত্রধর নামে এক বৃদ্ধা প্রতিদিন জঙ্গল পথ পেরিয়ে পায়ে হেঁটে মাথায় ঝুড়িতে করে বড়জোড়ার নিরশা গ্রামে চিঁড়ে বিক্রি করতে যেতেন। সেই চিঁড়ে বিক্রি করে পাওয়া ধান নিয়ে তিনি আবারো পায়ে হেঁটেই সোনামুখী (Sonamukhi) ফিরে আসতেন। যাওয়া-আসার পথে পড়তো একটি খাল। বৃদ্ধা তারিণী সূত্রধর বাড়ি ফেরার পথে সেই খালের পাশে খানিক বিশ্রাম নিয়ে সঙ্গে থাকা চিঁড়ে মুড়ি খেতেন। সেখানে প্রায় দিনই লাল পাড় শাড়ি পরা একটি ছোট্ট শ্যামাঙ্গী মেয়ে তার সাথে সোনামুখী আসার জন্য বায়না করতো। বৃদ্ধা প্রতিদিনই কিছু না কিছু বলে ঐ শিশু কন্যাকে বিরত রাখতেন। শেষে এক দিন সে জেদ ধরে বসল, বৃদ্ধার সাথে সে সোনামুখী যাবেই।

নিরুপায় তারিণী সূত্রধর তাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে সম্মত হলেন। কিছু দূর যাওয়ার পর ঐ ছোট্ট মেয়েটি জানায় সে আর হাঁটতে পারছে না। তাকে কোলে করে নিয়ে যেতে । কিন্তু মাথায় আর কোলে ধানের ঝুড়ি আর বস্তা থাকায় বৃদ্ধা তার অসহায়তার কথা বললেন, তবে ঐ কন্যা বৃদ্ধার মাথায় থাকা ঝুড়িতেই চাপার কথা বলে। নিরুপায় তারিণী সূত্রধর তাই করেন। পরে তিনি বাড়ি ফিরে দেখেন ঝুড়িতে মেয়ে তো নেই। তার বদলে রয়েছে দু’টি পাথর। ভয় পেয়ে তিনি সেই পাথর দু’টিকে তুলসীতলায় রেখে দেন।

সেদিন রাত্রেই বৃদ্ধা স্বপ্নাদেশ পান, সেই শ্যামাঙ্গী ওই ছোট্ট মেয়ে তাকে বলছে “আমার পুজোর ব্যবস্থা কর। তোর বাড়ির আঁকড় গাছের নিচে আমাকে রেখে আয়। আমি মা কালী, তোর ভার বইতে যাতে কোন কষ্ট না হয় তাই এই পাথর রুপে এসেছি।” ভয় পেয়ে পর দিন সকালে ঐ বৃদ্ধা লালবাজার এলাকার মানুষকে সব কথা জানান। সেই সময় ছোঁয়া-ছুঁয়ি আর জাতপাতের ঘটনা এতটাই তীব্র ছিল পুরোহিত পুজো করতে অস্বীকার করেন। গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন পুরোহিত। পরে তিনিও স্বপ্নাদেশ পেয়ে এই পুজো করতে রাজী হন। স্বপ্নাদেশে স্থানীয় জমিদার গিন্নী কাদম্বরী দেবী মন্দির নির্মাণের জন্য এক খণ্ড জমি ও পুজো পরিচালনার জন্য কিছু জমি দেন। তখন থেকেই এই পুজো এলাকার মানুষ পরিচালনা করছেন।

তবে বর্তমানে ওই এলাকায় তৈরী হয়েছে সুদৃশ্য মন্দির। কিন্তু প্রাচীণ সেই প্রথা মেনে আজও সূত্রধররাই কেবল ঘট আনার অধিকারী। এই ঘট সারা বছর মন্দিরে রেখে পুজো করা হয়। পরের বছর বাৎসরিক পুজোর সময় সেই ঘট বিসর্জন দিয়ে নতুন ঘট আনা হয়।

কিন্তু ‘হট্ নগর কালী’র নামকরণ নিয়ে এলাকায় দ্বিমত রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, হট্ নামে এক যোগী পুরুষ এই কালীর পুজার্চণা করতেন। তাই এরুপ নামকরণ। আবার কেউ বলেন, মা কালী হঠাৎ এসেছিলেন। তাই হট্ নগর কালী নামকরণ ।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, মা কালীর নির্দেশে যে আঁকড় গাছের নিচে পাথর দু’টি রাখা হয়েছিল সেই গাছ আজও আছে। আশ্চর্য্যের বিষয় সেই গাছে কোন কাঁটা নেই। এমনকি ঐ গাছের আদি মূলের কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। আর পাথর দু’টি আজও সেই আঁকড় গাছের নিচে রেখে পুজার্চণা করা হয়। তবে আশ্চর্য্যের বিষয় ঐ পাথর দু’টি ঋতুভেদে রং পরিবর্তন হয়,এমনটাই দাবী স্থানীয়দের।

পরে বর্ধমানের এক সমাজসেবী অজিত সিংহ নতুন মন্দির তৈরী করে দেন। বর্তমানে সেই মন্দিরেই পুজো হয় মাকালীর । এই মন্দির নির্মাণেও অভিনবত্ত্ব রয়েছে। মূল মন্দিরের সামনে রাখা রয়েছে, তারিণী সূত্রধরের মাথায় ধানের ঝুড়িতে চেপে মা আসছেন তার মূর্তি। অন্য দিকে সিদ্ধপুরুষ হট্ যোগীর মূর্তি। সবার উপরে শিব।

গৌরাঙ্গ ঘোষাল নামের এক শহরবাসী জানান , এবছর আমাদের মন খারাপ অন্যান্য বছর আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে যেভাবে পুজোতে আনন্দ করি এবার তা আর হবেনা । সরকারি নির্দেশ মতো এবছর পুজো সম্পন্ন হবে বলেই তিনি জানান ।

এই মুহূর্তে

x