31.3 C
Durgapur
Monday, July 26, 2021

মাটির গন্ধ ,আভিজাত্যের মিশেলে ভরপুর সুরুল সরকার বাড়ির দুর্গাপুজো

শুভময় পাত্র, বীরভূম: লালমাটির দেশ বীরভূম , সেখানে যে কটি সাবেকি দুর্গাপুজোর সন্ধান পাওয়া যায় তাদের মধ্যে সুরুলের (Surul) সরকার বাড়ির দুর্গোৎসব বিশেষ উল্লেখযোগ্য । শান্তিনিকেতন থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার দূরে চারপাশ আলো করে দাঁড়িয়ে রয়েছে সুরুল রাজবাড়ি।

পুজোর মাস খানেক আগে এখানে শুরু হয়ে যায় পুজো পুজো মেজাজ । শেষ কদিন ধরে পুজোর প্রস্তুতিও চলে তুঙ্গে। নাটমন্দিরে প্রতিমা সাজানোর কাজ , বাহারি আলো দিয়ে গোটা বাড়ি সাজানো , সব মিলিয়ে বছরের এই ক’টা দিন গমগম করে রাজবাড়ি। পঞ্চমী থেকেই নাটমন্দির আর ঠাকুরদালান সেজে ওঠে রঙিন বাতি আর ঝাড়লন্ঠনে।

যে কোনো রাজবাড়ির মূল কাঠামো যে রকম হয়, সরকারবাড়ি তার থেকে খুব একটা আলাদা নয়। মাঝখানে নাটমন্দির , উঁচু দালান , মোটা মোটা থাম্বা। নাটমন্দিরকে ঘিরে রয়েছে রাজবাড়ি । সামনে এক ঢালা লম্বা বারান্দা ,পর পর সারি দিয়ে রয়েছে ঘর । অনেকেই সুরুল গ্রামের সরকার বাড়িকে রাজবাড়ী মনে করলেও কোনও রাজা এখানে ছিলেন না ।

সুরুল সরকার বাড়ির আদিপুরুষ ভারত চন্দ্র সরকার ছিলেন বর্ধমান জেলার ছোট নীলপুরের বাসিন্দা । ভারত চন্দ্র সরকার ও তাঁর পত্নী বিমলা দেবী ছিলেন নিঃসন্তান। গুরুদেবের নির্দেশে এই নিঃসন্তান দম্পতি চলে আসেন সুরুল গ্রামে । সেখানেই বৈষ্ণব ধর্ম অবলম্বন করে বসবাস শুরু করেন । বাকসিদ্ধ গুরুদেবের কথা মত সেখানেই তাদের একমাত্র সন্তান কৃষ্ণহরি সরকারের জন্ম হয়।

অষ্টাদশ শতকের প্রথমদিকে ভারত চন্দ্র সরকার সুরুল গ্রামে আসার পর থেকেই তাঁর বংশবৃদ্ধি ও ব্যবসার ব্যাপক উন্নতি হয়। সময়ের সাথে সাথে আর্থিক শ্রীবৃদ্ধি ঘটতে থাকে সরকার পরিবারের। কৃষ্ণহরির ছেলে শ্রীনিবাস ইংরেজদের সঙ্গে ব্যবসা করে রীতিমতো নামডাক করেছিলেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে জন চিপ সাহেবের সহযোগিতায় শ্রীনিবাস সরকার বিশাল প্রতিপত্তি অর্জন করেন।

ভরতচন্দ্রের আমল থেকে সরকারবাড়ির দুর্গাপুজো শুরু হলেও পরবর্তীতে মানবেন্দ্র ও মাধবেন্দ্র সরকার এই দুই ভাইয়ের তরফে আলাদা আলাদা পুজো হতে শুরু করে। আদি পুরুষ বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী হওয়ায় ‘রাধাবিনোদ’ ও ‘শ্যামচাঁদ’ এর পাশাপাশি দেবীদুর্গার ঘটা করে আরাধনা করা হয় এই সরকার বাড়িতে । পরবর্তীকালে তৈরি হয় ‘চক মিলান’ দালান। ‘রাধাবিনোদ’ মন্দির ‘শ্যামচাঁদ’ মন্দির প্রভৃতি ঐতিহাসিক নিদর্শন পাওয়া যায় এই সুরুল গ্রামে। দশম পুরুষ ধরে চলে আসছে আরাধনা।

করোনা আবহে সুরুল সরকার বাড়ির দুর্গাপুজো এবছর ২৮৬ তম বর্ষে পদার্পন করল। সাবেকিয়ানায় ভরা একেবারে গ্রাম্য আবহে চতুর দোলায় নিয়ে আসা হয় দেবী দুর্গাকে। অন্যান্যবার তিনদিন ধরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের পাশাপাশি যাত্রাপালা আয়োজন করে এই সরকার বাড়ি। সরকার বাড়িকে কেন্দ্র করে চকমিলান দালানের সামনে বসে ছোটখাটো এক গ্রাম্য মেলা। আশেপাশের গ্রাম ছাড়াও দূর দূরান্ত থেকে মানুষও বীরভূমের সুরুল গ্রামে ছুটে আসেন গ্রামের সাবেকি পুজো দেখার টানে।

কিন্তু এবার যেন সব অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে । সরকার বাড়ির এক সদস্য জানান এবছর কোভিড সতর্কতার কারণে হবে না কোন যাত্রাপালা, বসবেনা মেলা, নাগরদোলা । যেটুকু না করলেই নয় সেরকমভাবেই বর্তমান পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে, সরকারি নির্দেশ মেনে পালিত হবে দুর্গোৎসব। সামাজিক দূরত্ব মেনে দর্শন করতে দেওয়া হবে দেবীদুর্গাকে।

এই মুহূর্তে

x